
ভুল রিপোর্টে ক্যামো, চিকিৎসার নামে প্রতারণা
চিকিৎসার নামে প্রতারণা, ভুল রিপোর্টে ক্যানসার চিকিৎসা, চিকিৎসাব্যবস্থায় আস্থার সংকট, বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়—এই চারটি বাস্তবতা এখন অনেক রোগীর অভিজ্ঞতায় ভয়াবহ প্রশ্ন হয়ে উঠছে। ক্যানসার হয়েছে বলে জানিয়ে ক্যামোথেরাপি দেওয়া, অপারেশনের প্রস্তুতি—অথচ পরে জানা যায় ক্যানসারই ছিল না; এমন ঘটনার বর্ণনা উঠে এসেছে একটি প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষক ফিরোজা খাতুনকে ক্যানসার রোগী হিসেবে শনাক্ত করে একে একে চারটি ক্যামোথেরাপি দেওয়া হয় এবং স্তন অপসারণের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছিল। পরে স্বজনদের পরামর্শে তিনি ভারতে যান। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান—তার ক্যানসার হয়নি, তিনি সুস্থ। দেশে করা পরীক্ষার রিপোর্ট ও চিকিৎসা নিয়ে এরপর দীর্ঘদিন মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় কাটে বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
ফিরোজার মতো ঘটনার কথা শুধু একক নয়—এ ধরনের ভুল রোগনির্ণয়, ভুল রিপোর্ট বা অনাকাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা নিয়ে মানুষের শঙ্কা বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। যারা সামর্থ্য রাখেন, অনেকেই চিকিৎসা নিতে বিদেশমুখী হন; আর যারা যেতে পারেন না, তারা ভোগান্তি ও ব্যয়ের চাপে পড়ে আরও অসহায় হয়ে যান—এমন বক্তব্যও উঠে আসে।
ঢাকার খিলগাঁও এলাকার বাসিন্দা ফখরুল আলমের অভিজ্ঞতার কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। তিনি জানান, একটি বেসরকারি হাসপাতালে খতনা করাতে গিয়ে তার বড় ছেলের মৃত্যু হয়। এরপর পরিবারে চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে; এমনকি ছোট ছেলের খতনা করানো নিয়েও তারা ভয় পাচ্ছেন।
একই প্রতিবেদনে বেসরকারি চাকরিজীবী বজলুর রহমানের ভোগান্তির কথাও বলা হয়। পেটে ব্যথার সমস্যায় দেশে একাধিক চিকিৎসকের কাছে গিয়ে, নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও রোগ নির্ণয় না হওয়ায় তিনি প্রায় এক বছরে চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বড় অঙ্কের টাকা ব্যয় করেন। পরে ভারতে গিয়ে নাকি রোগ শনাক্ত হয়—এমন দাবি করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, সেবা পেতে ভোগান্তি, ভুল রিপোর্ট, রোগীকে পর্যাপ্ত সময় না দেওয়া, দায়িত্বে অবহেলা, স্বাস্থ্যসেবায় বাণিজ্যিক মনোভাব এবং নজরদারি-জবাবদিহির ঘাটতি—এগুলো মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যান এবং এতে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশের বাইরে চলে যায়।
প্রতিবেদনে ২০২৪ সালে ঢাকার সাঁতারকুলে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খতনা করাতে গিয়ে শিশু আয়ান আহমেদের মৃত্যুর প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়। ঘটনার পর তদন্ত কমিটির সুপারিশ, ক্ষতিপূরণ ও আইনানুগ ব্যবস্থা—এসব বাস্তবায়ন না হওয়ায় জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
সার্বিকভাবে প্রতিবেদনের ভাষ্য—রোগ নির্ণয় থেকে চিকিৎসা, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা থেকে নজরদারি—সব জায়গায় কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা ও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে রোগী হয়রানি ও আস্থাহীনতা আরও বাড়তে পারে।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

